পূজায় প্রিয়াঙ্কা গোপের রান্না

সারা বছরই গানের নানা অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত থাকেন সংগীতশিল্পী প্রিয়াঙ্কা গোপ। এত ব্যস্ততার মধ্যে নিয়মিতই পরিবারের সদস্যদের জন্য নিজ হাতে রান্না করেন তিনি। ‘আসলে রান্নার প্রতি আগ্রহ আমার একেবারেই ছিল না। তবে আমার স্বামী সুবীর মিত্র খুব খাদ্যরসিক মানুষ। তার খাবারের প্রতি আগ্রহের কারণে রান্নার প্রতি আগ্রহ জন্মে আমার।’ বলছিলেন প্রিয়াঙ্কা গোপ।

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে নকশার জন্য বিশেষ কিছু পদ রাঁধলেন তিনি। জানালেন, মা ভানু রানী গোপের কাছ থেকে শিখেছেন এসব রান্না। এখনো যদি কোনো রান্না ভুলে যান, সরাসরি ফোন করেন মাকে। প্রিয়াঙ্কা বলছিলেন, ‘ছোট বেলায় মা কোনো কিছু রান্না করলেই সেটার স্বাদ পরখ করতে দিতেন আমাদের। বিশেষ করে মা যখন নাড়ু বানাতেন তখন দেখা যেত, সেগুলো চাখতে গিয়ে টপাটপ একটার পর একটা নাড়ু খেয়ে ফেলছি। এই কাজটা এখন
আমার স্বামী করে থাকেন। দেখা যায়, স্বাদটা কেমন হলো এটা দেখার জন্য তাকে একটু খাবার পরখ করতে দিলে সেটা সে একটু একটু করে পুরোটাই খেয়ে ফেলেন।’

দুর্গোৎসবের সপ্তমীর দিন বিশেষ খাবারদাবারের আয়োজন থাকে প্রিয়াঙ্কা গোপের বাড়িতে। এই দিন প্রতিবেশীদের জন্য নিজ হাতে পূজার খাবার রেঁধে থাকেন। এর মধ্যে থাকে খিচুড়ি, লাবড়া, সয়াবিনের তরকারি, ছানার ছক্কা, পায়েস, দুধের নাড়ুসহ আরও মজার সব খাবার। সুন্দর থালাবাসনে পরিবেশন করে সেগুলো প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি পাঠান। পূজার বাকি দিনগুলোয় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরে বেড়ান মণ্ডপে মণ্ডপে। এর মধ্যে গানের অনুষ্ঠানেও সময় দেন প্রিয়াঙ্কা গোপ। নকশার জন্য প্রিয়াঙ্কা গোপ দিলেন বিশেষ কিছু রেসিপি।

চিংড়ির পুরভরা পটোলের দোলমা

উপকরণ: পটোল ৬টি, ছোট চিংড়ি ১ কাপ, নারকেল কোরানো ১ কাপ, সয়াবিন তেল ১ কাপ, জিরাবাটা ১ টেবিল চামচ, আদাবাটা ১ টেবিল চামচ, পোস্তবাটা ১ চা–চামচ, শুকনা মরিচের গুঁড়া আধা চা–চামচ, হলুদগুঁড়া ১ চা–চামচ, পেঁয়াজবাটা ১ চা–চামচ, কাঁচা মরিচ ও লবণ স্বাদ অনুযায়ী, ফোড়নের জন্য জিরা আধা চা–চামচ, শুকনো মরিচ ৩টি ও তেজপাতা ১টি।

প্রণালি: চিংড়ি ভেজে রাখুন। এরপর পটোলের ভেতরের পুর তৈরি করে নিতে হবে। পটোলের মুখের এক পাশ কেটে ছুরি বা চামচের পেছনের অংশ দিয়ে ভেতরের বীজ বের করে নিতে হবে। বীজগুলো নারকেলের সঙ্গে আধা বাটা করে নিতে হবে। এবার এর সঙ্গে হালকা করে ভেজে রাখা চিংড়িগুলো দিয়ে দিন। এই মিশ্রণের মধ্যে হলুদগুঁড়া, ১ চা–চামচ জিরাবাটা, ১ চা–চামচ আদাবাটা, শুকনা মরিচের গুঁড়া একসঙ্গে মিশিয়ে তেলে ভালোভাবে কষিয়ে নিলেই পুর তৈরি।

এবার চুলায় অন্য একটা পাত্রে আগেই লবণ ও হলুদ মাখিয়ে রাখা পটোলগুলোর ভেতরে পুর ভরে মুখটা রেখে দেওয়া বাকি অংশ দিয়ে টুথপিক দিয়ে আটকে দিন। পটোলগুলো বাইরে দিয়ে ছুরি দিয়ে একটু করে চিড়ে দিতে হবে, যাতে ভেতর থেকে ভাপটা বের হয়ে যায়। এবার পটোলগুলোকে তেলে ভেজে তুলে নিন। এবার তেলে ফোড়ন দিয়ে বাকি মসলা, কাঁচা মরিচ আর লবণ দিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে নিন। তেল ছেড়ে দিলে তাতে কিছুটা পানি দিতে হবে, ফুটে উঠলে পটোলগুলো দিয়ে ঢেকে দিন। ৫ থেকে ৭ মিনিট পর মসলাগুলো গা মাখা হয়ে এলে নামিয়ে নিতে হবে। এভাবেই তৈরি হয়ে গেল মজাদার চিংড়ির পুরভরা পটোলের দোলমা।

সবজি খিচুড়ি

উপকরণ: পোলাওর চাল ১ কেজি, ভাজা মুগ ডাল আধা কেজি, মটর ডাল ২৫০ গ্রাম, বড় আলু ২টি, ফুলকপি ১টা, পেঁপে ২ কাপ, কুমড়া খোসাসহ ২ কাপ, পটোল ২ কাপ, গাজর ১ কাপ (সব সবজি কিউব করে কাটা), বাঁধাকপি ১ কাপ, ছোট সয়াবিন সেদ্ধ ১ কাপ, আদাবাটা দেড় চা-চামচ, জিরাবাটা ১ চা-চামচ, হলুদগুঁড়া ১ চা-চামচ, লবণ স্বাদমতো, চিনি ১ চা-চামচ, ঘি ১ চা-চামচ, সয়াবিন তেল ১ কাপ, গরমমসলার গুঁড়া আধা চা-চামচ এবং ফোড়নের জন্য পাঁচফোড়ন ২ চা-চামচ, তেজপাতা ৩-৪টি, শুকনো মরিচ ৩-৪টি ও কাঁচা মরিচ ৮-১০টি।

প্রণালি: প্রথমে আলু, ফুলকপি, পটোল ও সয়াবিন অল্প লবণ আর হলুদ দিয়ে ভেজে রাখতে হবে খিচুড়ির ফোড়নের জন্য। ১ চা-চামচ তেল রেখে বাকি তেলে অর্ধেক পাঁচফোড়ন, ২টি তেজপাতা, ৩টি শুকনো মরিচ দিয়ে সুন্দর একটা ঘ্রাণ বের হলে তাতে আদাবাটা, জিরাবাটা, কাঁচা মরিচ, হলুদ, লবণ দিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে নিতে হবে। মসলায় তেল ছেড়ে দিলে তাতে ফুলকপি, বাঁধাকপি আর পটোল বাদে বাকি সব সবজি দিয়ে ভালোভাবে নাড়ুন। সবজিগুলো অর্ধেক সেদ্ধ হয়ে এলে তাতে ভিজিয়ে রাখা চাল ও ডাল দিয়ে ভালোভাবে কষান। মিনিট পাঁচেক পরে পানি দিয়ে নেড়েচেড়ে মাঝারি আঁচে ঢেকে দিন। মাঝে মাঝে নেড়ে দিতে হবে, যাতে লেগে না যায়। খিচুড়ির চাল-ডাল সেদ্ধ হয়ে এলে বাকি সবজিগুলো মিশিয়ে নিয়ে আরও ১০ মিনিট রান্না করুন। এরপর অন্য একটি পাত্রে রেখে দেওয়া তেলে ফোড়নের বাকি মসলা দিয়ে নেড়েচেড়ে সেটা খিচুড়িতে ঢেলে মিশিয়ে নিতে হবে। চুলা বন্ধ করে সবশেষে ঘি, গরমমসলা আর চিনি মিশিয়ে নামিয়ে নিন।

ছানার ছক্কা

উপকরণ: দুধ ২ লিটার, লেবুর রস ২ টেবিল চামচ, আলু ১ কাপ (কিউব করে কাটা), ময়দা ১ টেবিল চামচ, হলুদগুঁড়া ১ চা–চামচ, চিনি ১ চা–চামচ, মরিচগুঁড়া আধা চা–চামচ, জিরাবাটা ১ টেবিল চামচ, আদাবাটা ১ চা–চামচ, গরমমসলার গুঁড়া আধা চা–চামচ, কাজুবাদাম বাটা ১ চা–চামচ, কিশমিশ ১০ থেকে ১২টি, কাঁচা মরিচ ৩টি, (ফোড়নের জন্য) তেজপাতা ২টি, শুকনো মরিচ ১টি, জিরা আধা চা–চামচ, দারুচিনি আধা ইঞ্চি, এলাচি ২ থেকে ৩টি।

প্রণালি: দুধ জ্বালে বসিয়ে প্রথম বলক এলেই তাতে ধীরে ধীরে লেবুর জল মিশিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নাড়তে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুধ ফেটে উঠবে। এবার একটা পাতলা সুতির কাপড়ে দুধটুকু ঢেলে আধা ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখতে হবে । সবটুকু পানি ঝরে গেলে এর সঙ্গে ময়দা, লবণ ও অল্প চিনি দিয়ে ভালো করে মাখাতে হবে। ছানার ডো ছোট ছোট কিউব আকারে কেটে ফ্রিজে আধা ঘণ্টা রেখে দিন। এবার একটি পাত্রে তেল দিয়ে তাতে লবণ ও হলুদ দিয়ে মেখে রাখা আলুগুলো ভেজে নিন। ছানাগুলো ও হলুদ মেখে ভেজে নিন। এবার একটি পাত্রে তেলে ফোড়ন দিয়ে তাতে বাকি মসলা ও আলু দিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে নিতে হবে। কষানো হয়ে গেলে ২ কাপ জল দিতে হবে। ঝোল ফুটে উঠলে ছানাগুলো দিয়ে ৩ মিনিট ঢেকে রান্না করে নিন। এরপর ঘি আর গরমমসলা গুঁড়া দিয়ে নেড়েচেড়ে নামিয়ে নিতে হবে।

দুধের সন্দেশ

উপকরণ: দুধ ২ লিটার, গুঁড়া চিনি ২৫০ গ্রাম ও এলাচির গুঁড়া আধা চা-চামচ।

প্রণালি: মাঝারি আঁচে দুধ জ্বাল দিয়ে অর্ধেক করে নিন। তারপর মাঝারি আঁচে রেখে অনবরত নাড়তে থাকুন। খেয়াল রাখুন ওপরে সর না পড়ে ও নিচে লেগে না যায়। এবার দুধ আধা লিটার হয়ে এলে চিনি ও এলাচির গুঁড়া দিতে হবে। নাড়তে নাড়তে ক্ষীর আঠালো হয়ে এলে নামিয়ে হাতে সামান্য ঘি নিয়ে গরম অবস্থাতেই গোল করে পছন্দমতো ছাঁচে বসিয়ে নিলেই তৈরি দুধের সন্দেশ। গরম অবস্থাতে না করলে শক্ত হয়ে যাবে।

বেগুনের মুচমুচে ভাজা

উপকরণ: কালো গোল বেগুন ২টি, চালের গুঁড়া আধা কাপ, ময়দা ১ টেবিল চামচ, হলুদগুঁড়া আধা চা-চামচ, মরিচগুঁড়া আধা চা-চামচ, লবণ স্বাদমতো, চিনি আধা চা-চামচ ও ভাজার জন্য তেল।

প্রণালি: প্রথমে বেগুন এক ইঞ্চি আকারে গোল করে কেটে মাঝখানে ভাগ করে নিন। বেগুনে সামান্য লবণ ও চিনি দিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিন। এবার চালের গুঁড়া, ময়দা, হলুদগুঁড়া, মরিচগুঁড়া ও সামান্য লবণ (যেহেতু বেগুনে আগেই লবণ আছে) কিছুটা ঘন মিশ্রণ তৈরি করে নিন। ঘনত্ব এমন হবে, যাতে বেগুনের গা থেকে গড়িয়ে পড়ে না যায়। এবার বেগুনগুলো এক এক করে মিশ্রণে গড়িয়ে মাঝারি আঁচে ডুবো তেলে মুচমুচে সোনালি করে ভেজে তুলুন।

ভেটকি মাছের পাতুরি

উপকরণ: ভেটকি মাছের ফিলে ৪ টুকরো, কালো সরিষা ১ চা–চামচ, লাল সরিষা ১ চা–চামচ, পোস্তদানা দেড় চা–চামচ, সরিষার তেল ২ টেবিল চামচ, হলুদগুঁড়া ১ চা–চামচ, কাঁচা মরিচ ৮ থেকে ১০টি, নারকেল কোরানো ১ কাপ, টক দই ২ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদ অনুযায়ী ও কলাপাতা ১টি।

প্রণালি: প্রথমে কলাপাতার মাঝখানের শক্ত শিরা কেটে নরম পাতাকে আট টুকরো করে তাওয়ায় সেঁকে নিতে হবে (এটা করলে পাতা ভাঁজ করলে ফেটে যাবে না)। এবার মাছগুলো লবণ ও ফেটিয়ে নেওয়া টক দই দিয়ে আধা ঘণ্টা ম্যারিনেট করে রাখতে হবে। এরপর সরিষা, পোস্ত, নারকেল ও কাঁচা মরিচ একসঙ্গে মিহি করে বেটে নিন। খেয়াল রাখতে হবে, মিশ্রণ যেন পাতলা না হয়ে যায়। এবার মিশ্রণটির সঙ্গে হলুদগুঁড়া, স্বাদমতো লবণ ও সরিষার তেল মিশিয়ে নিতে হবে। আধা ঘণ্টা পর কলাপাতায় ১ চামচ মিশ্রণ দিয়ে ওপরে মাছ বসিয়ে তার ওপর আরেক প্রস্থ মিশ্রণটি দিয়ে ওপরে অল্প সর্ষের তেল আর একটা কাঁচা মরিচ দিয়ে পাতাটি ভালোভাবে মুড়িয়ে টুথপিক দিতে আটকে দিতে হবে। সব কটি তৈরি হয়ে গেলে চুলায় নন–স্টিক প্যানে অল্প সরিষার তেল ব্রাশ করে পাতাসমেত মাছগুলো দিয়ে মাঝারি আঁচে ঢেকে দিতে হবে। এক পাশ লাল হয়ে এলে উল্টে দিতে হবে। এভাবে দুই পাশ যখন লাল হয়ে একটা পোড়া পোড়া ভাব আসবে, বুঝতে হবে হয়ে গেছে ভেটকি মাছের পাতুরি।

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *